কলকাতা, ২৬ মার্চ, ২০২৬:
একটি ব্যস্ত রেল স্টেশনের সকাল কল্পনা করুন: ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের বাঁশি, টাটকা চায়ের সুগন্ধ এবং একটি যাত্রার প্রতীক্ষা। এখন ভাবুন, সেই একই দৃশ্য যদি যত্রতত্র ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট এবং লাইনের ধারে জমে থাকা আবর্জনায় ভরে থাকে। বছরের পর বছর ধরে, আবর্জনা ভারতীয় রেলের এক নীরব যাত্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে—এমন এক অনাহুত অতিথি যা কেবল দেখতেই খারাপ নয়, বরং সমস্যার এক দীর্ঘ তালিকা তৈরি করে। ট্র্যাকের ওপর আবর্জনা জমা হওয়া কেবল দৃষ্টিকটু নয়, এটি সুষ্ঠু ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রেও এক বড় বাধা। কারণ এই বর্জ্য নিকাশি ব্যবস্থাকে রুদ্ধ করে দেয়, যার ফলে বৃষ্টির সময় জল জমে ট্রেন চলাচলে দেরি হতে পারে এবং যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে। যাত্রীদের জন্য এর অর্থ হলো দুর্গন্ধ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ভ্রমণের আনন্দ নষ্ট হওয়া।
একটি পরিচ্ছন্ন যাত্রা যাত্রীদের মৌলিক অধিকার, তা স্বীকার করে নিয়ে পূর্ব রেলওয়ে তার বিভাগ ও ওয়ার্কশপগুলিকে পরিচ্ছন্ন করার অভিযান আরও জোরদার করেছে। গত তিন মাসে এক বিশাল লজিস্টিক সাফল্যের মাধ্যমে রেলওয়ে মোট ৪৩২৩.৭৮ মেট্রিক টন (MT) আবর্জনা পরিষ্কার করেছে। শহরের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে শিল্প কারখানা বা ওয়ার্কশপ—পূর্ব রেলওয়ে নেটওয়ার্কের প্রতিটি প্রান্ত এই বিশাল অভিযানে অংশ নিয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই নিরলস প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।
এই তিন মাস সময়কালে বিভিন্ন বিভাগ এবং ওয়ার্কশপগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ফলাফল পাওয়া গেছে। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, হাওড়া বিভাগ মোট ৩৭৭.৪০ মেট্রিক টন এবং শিয়ালদহ বিভাগ ৩১৭.০০ মেট্রিক টন আবর্জনা পরিষ্কার করেছে। আসানসোল বিভাগ সফলভাবে ১১০.০০ মেট্রিক টন এবং মালদা বিভাগ ১০২.০০ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। শিল্প ওয়ার্কশপগুলিও এক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে; লিলুয়া ওয়ার্কশপ ১১৮৫.৬৫ মেট্রিক টন, কাঁচরাপাড়া ওয়ার্কশপ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ১৬৮২.২৯ মেট্রিক টন এবং জামালপুর ওয়ার্কশপ ৫৪৯.৪৪ মেট্রিক টন বর্জ্য পরিষ্কার করেছে। সব মিলিয়ে মোট ৪৩২৩.৭৮ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারিত হয়েছে।
কোচগুলোর যান্ত্রিক পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে নিয়মিত ট্র্যাক পর্যবেক্ষণ—পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে পূর্ব রেলওয়ে প্রতিটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে, কেবল কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। কারণ রেল চত্বরে পাওয়া অধিকাংশ বর্জ্যই আসে প্রতিদিনের যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা থেকে। পূর্ব রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেউস্কর যাত্রীদের উদ্দেশে জানিয়েছেন যে, ভারতীয় রেল তাঁদের নিজস্ব সম্পত্তি এবং এই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে তাঁদের উদ্যোগী হওয়া উচিত। যাত্রীদের আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রেলওয়ে পরিষ্কার রাখা কেবল নাগরিক কর্তব্যই নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতাও বটে। ১৯৮৯ সালের রেলওয়ে আইনের ১৪৫(বি) এবং ১৫৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রেল চত্বরে কেউ নোংরা করলে বা উপদ্রব সৃষ্টি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য জরিমানা বা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।









